অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৬৬ বার পঠিত
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ২৪ অক্টোবর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক সংস্থার পথচলা শুরু হয় ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ আট দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসন, মানবাধিকার রক্ষা, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দিবসটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক মূল্যবোধ ও শান্তির গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি বাস্তবায়নে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তার আগে প্রতিষ্ঠিত লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় একটি কার্যকর বৈশ্বিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তোলে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে সংস্থাটির সদর দপ্তর অবস্থিত। ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বা ‘জাতিসংঘ’ নামটি প্রস্তাব করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করাই জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান ভূমিকা।
জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব। সংস্থাটির বর্তমান মহাসচিব পর্তুগালের নাগরিক আন্তোনিও গুতেরেস।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিষদটি ১৫ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত, যার মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী এবং ১০টি অস্থায়ী সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই পাঁচ দেশের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত, যুদ্ধবিরতি, শান্তিরক্ষা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পরিষদটির সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষা হলো ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। তবে সচিবালয়ের কার্যকরী ভাষা ইংরেজি ও ফরাসি।
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় দেশটি। এরপর থেকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তিরক্ষা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে বাংলাদেশ।
বিশেষ করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে কর্মকর্তা পাঠানোর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজে বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি জোরদার করার পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মতামত তুলে ধরা, আলোচনা এবং বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। এ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ২ জুন সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ফলে সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ইতিহাসও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করলেও বর্তমান বিশ্বে সংস্থাটিকে নানা জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসন, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর।
জাতিসংঘ দিবস শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি আন্তর্জাতিক শান্তি, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের প্রতি সম্মিলিত দায়বদ্ধতা স্মরণ করারও উপলক্ষ। বৈশ্বিক সমস্যাগুলো কোনো একক দেশের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই পারস্পরিক সহযোগিতা, সংলাপ এবং বহুপক্ষীয় উদ্যোগের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
জাতিসংঘের ৮১ বছরের পথচলা বিশ্বকে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, বৈরিতার পরিবর্তে সহযোগিতা এবং বৈষম্যের পরিবর্তে মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ দিবসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা—জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য বাস্তবায়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান অব্যাহত রাখবে।
Posted ১১:১২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন